-:যোগ্যতা:-
*একবার মহারাজ আকবর প্রতিবেশী রাজ্য থেকে এক বিশেষ উপলক্ষে আমন্ত্রণ পেলেন। এবং তিনি চট জলদি করে বীরবল কে ডেকে পাঠিয়ে..., সেই বিশেষ উপলক্ষে পড়ে যাওয়ার জন্য এক দারুণ পোশাক তৈরি করানোর জন্য বললেন। বীরবল তখনই মহারাজের প্রিয় দর্জিকে ডেকে পাঠালেন।দর্জি পোশাক তৈরি করার জন্য সকল আবশ্যক জিনিসপত্র নিয়ে দরবারে এসে হাজির হলো।মহারাজ আকবরের মাপ নিয়ে ও সেই পোশাক তৈরি করার কাজ শুরু করে দিল।সেই পোশাক যেহেতু মহারাজ আকবর এক বিশেষ উপলক্ষে পড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা ছিলেন,তাই উনিও কৌতূহলবশত!.... কিছু সময়ের জন্য দর্জির,কাছে বসে ওর কাজ দেখতে লাগলেন।
*দর্জি নিজের কাজ শুরু করে সবার প্রথমে কাঁচি দিয়ে কাপড় কে আলাদা আলাদা কয়েক টুকরো কেটে মাটির উপরে কাঁচি চাপা দিয়ে রেখে দিল।তারপর সূচ দিয়ে কিছু কাজ করার পরে সেই দর্জি নিজের অভ্যাস অনুসারে সূচ টাকে রাজদরবার থেকে প্রাপ্ত নিজের পাগড়ি তে গেঁথে রাখলো। মহারাজ আকবরের এই দেখে কিছুটা অদ্ভুত লাগল যে, এত দামী আর সুন্দর কাঁচি দর্জির পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে আর এত তুচ্ছ একটা সূচ দর্জি নিজের মূল্যবান পাগড়ি তে গেঁথে রাখলো!মহারাজ আকবর নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে, বীরবল কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।বীরবল বললেন মহারাজ দর্জি দুটো জিনিস কে সেগুলির আসল যোগ্যতা অনুসারে ঠিক জায়গাতেই রেখেছে, আর আমার মতে ও ঠিকই করেছে।
*মহারাজ আকবর রেগে উঠে বীরবল কে বললেন-..."তুমি সব ব্যাপারে ভালো করে ভাবনা চিন্তা না করেই,কথা বলে দাও"। তুমি এমন টা,এতটা বিশ্বাস এর সাথে কি করে বলতে পারো যে দর্জি কোন ভুল করেনি। তুমি এটা কি করে জানবে... যে মাত্র কয়েক পয়সার একটা সুচের তুলনায় আমার দরবারের রাজকীয় কাঁচি কতটা মূল্যবান? তাও তুমি এমন টা বলছো যে..... দর্জি ঠিক কাজই করেছে। তুমি কি তোমার এমন বক্তব্যে সমর্থনের কোন কারণ জানাতে আমাকে পারবে?
বীরবল মহারাজকে বলতে শুরু করলেন-......মহারাজ!আপনি নিশ্চয়ই তা লক্ষ্য করে থাকবেন যে কাঁচির কাজ হচ্ছে কেবল প্রতিটি জিনিসকে কেটে কয়েক টুকরো ভাগ করা।তাই সেই জিনিসটা কাপড় হোক বা অন্য কিছু। অন্যদিকে সুচ আকারে ছোট হওয়া সত্ত্বেও, সব জিনিসকে একসাথে যুক্ত করার কাজ করে।সূয প্রতিটি ছোট বড় জিনিস কে একসাথে যুক্ত করে সেটা কে আমাদের আবশ্যকতা অনুসারে ব্যবহার করার যোগ্য করে তোলে। যার ফলে সাধারণ জিনিসের মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে ওঠে। এটা ছোট্ট সুচের কামাল যে কাঁচি দিয়ে কাটা কাপড়ের টুকরোর উপরে সুন্দর করে সেগুলিকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে আপনার এই বহুমূল্য আর সুন্দর পোশাক তৈরি করছে।
*মহারাজ প্রতিটি জিনিসের মূল্য সেটার উপযোগিতা অনুসারে ঠিক করা হয়। তার সৌন্দর্য অনুসারে নয়।আপনি নিজের চারপাশে এমন বেশ কিছু লোককে দেখতে পাবেন সেই শ্রেণীতে অনেকেই আছেন যারা সমাজকে ধর্ম-জাতি,উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র,তাদের ভেদ-ভাব,দেখিয়ে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ করেন। অন্যদিকে সাধু সমাজের প্রতিটি শ্রেণীকে একসাথে যুক্ত করার কাজ করেন।যেকোনো কাজ একা করার চেষ্টা করলে হয়তো...সফলতা প্রাপ্ত নাও হতে পারে।কিন্তু মিলেমিশে করা কোন কাজ কখনো বিফল হয় না।সবাইকে একসাথে নিয়ে চলার লোকেদের সবাই মাথায় তুলে রাখে।আর তাদেরকে ভগবানের রূপ মেনে পূজা করে। বীরবলের এই বক্তব্য শুনে....
*মহারাজ আকবর ও এমনটা মেনে নিলেন যে যোগ্যতা আর সততার সাথে সাথে সংঘটিত হওয়া লোকেদের সামনে সবাই কে হার মেনে নিতেই হয়। নিজের বক্তব্য শেষ করার সাথে সাথে মহারাজ বললেন এই জন্য আমি রাজপ্রসাদের সকল কর্মচারীদের এমনটা বলে থাকি যে..... একা একা থাকা ব্যক্তিত্বের কোনো গুরুত্ব থাকেনা।আমাদের সর্বদাই সংগঠনের সাথে চলা উচিত, এর দ্বারাই বিজয় প্রাপ্ত হয়। যে ব্যক্তি নিজের জীবনের সুখ-শান্তি প্রাপ্ত করতে চাইলে তার প্রতিটি ছোট ছোট সম্পর্ক সূচের মতো যুক্ত করার চেষ্টা করা উচিত।
মহারাজ তখন বললেন..... বীরবল! তোমার পরামর্শগুলো প্রথমে তো তেতো ওষুধের মত লাগে,কিন্তু সেটা জীবনে গ্রহণ করলে জীবনে অনেক বেশি মিষ্টতা এসে পড়ে।
*আমাদেরও সর্বদা সুচ হয়ে থাকা উচিত কাঁচি হয়ে নয়।কারণ সূচ দুটো জিনিস কে এক করে। কাঁচি প্রতিটি জিনিস কে কেটে দুটো করে দেয়। এজন্য আপনারা যখন সূচ এর মতো সবাইকে এক সূত্রে বাঁধার চেষ্টা করবেন,তখন আপনারা সমাজে যে শ্রেণীর সাথে যুক্ত হোন না কেন গোটা পৃথিবীর লোক আপনাদের সামাজিক যোগ্যতাকে ভুলে গিয়ে তৎক্ষণাৎ আপনাদের নিজেদের মনের সিংহাসনে বসিয়ে নেবে।
*"কে কখন কার কতটা আপন হয়ে সময় সর্বদা ব্যক্তির আসল যোগ্যতা জানিয়ে দেয়"।




No comments:
Post a Comment